একটি সম্ভাবনার অপমৃত্যু
- Published in :
- Prothom Alo, 19-Nov-21
রাজধানীর মহাখালী থেকে কাকলী সড়ক প্রশস্ততার জন্য ১৯৫৮-৫৯ সালে জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। এর লক্ষ্য ছিল ভবিষ্যতে এমনভাবে পরিকল্পনা নেওয়া, যাতে দুই সড়ক থেকে আসা যানবাহনের গতি অক্ষুণ্ন রেখে মহাখালী-বনানী করিডরকে গতিশীল রাখা যায়। কিন্তু সেখানে গড়ে উঠেছে অনুমোদনহীন ভবন। এর মাধ্যমে ভবিষ্যৎ ঢাকার উত্তর-দক্ষিণমুখী চলাচলের মূল যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন সম্ভাবনার যে অপমৃত্যু ঘটেছে, সেটি রোধ করা জরুরি। রাজধানীর প্রধান সমস্যা কী? রাজধানীতে বাস করেন অথবা কোনো কাজে কয়েক দিনের জন্য ঢাকায় থেকেছেন, এমন যে কাউকে প্রশ্ন করা হলে একবাক্যে তিনি স্বীকার করবেন শহরের প্রধান সমস্যা যানজট। এ যানজটের সমস্যা কমিয়ে আনতে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা নানান উদ্যোগের পসরা সাজিয়েছে। কিন্তু এ উদ্যোগগুলো কতখানি দূরদর্শী কিংবা সমন্বিত পরিকল্পনার অংশ হতে পেরেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে যানজট নিরসনের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে উদ্যোগগুলো হয়ে উঠেছে সাংঘর্ষিক। কোনো কোনো কর্তৃপক্ষ নিজেই যানজট নিরসনের সম্ভাবনাকে কফিনে পুরে মেরে চলেছে একের পর এক পেরেক। ঢাকার যান চলাচল ব্যবস্থায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শহরের মূল সড়কগুলো উত্তর-দক্ষিণমুখী। প্রধানত পাঁচটি সড়ক দিয়ে এই নগরীর মূল যান চলাচল ব্যবস্থাটিকে সাজানো হয়েছে। সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অভাবেই এমন হয়েছে। মূলত সাতমসজিদ রোড, মিরপুর রোড, কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ অ্যাভিনিউ ও বীর উত্তম রফিকুল ইসলাম সরণি বা প্রগতি সরণি (রামপুরা-কুড়িল রোড) ঢাকার সড়ক ব্যবস্থাপনার ‘মূল করিডর’। পূর্ব-পশ্চিমের অনেকগুলো খণ্ডিত সড়ক (ক্রস রোড) মূল করিডরগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। পুরো শহরে এ রকম সড়ক ব্যবস্থাপনায় যান চলাচল করছে। ২. ঢাকা শহরের কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ ও শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ অ্যাভিনিউ সড়ক দুটি যান চলাচলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সবচেয়ে দীর্ঘ। মূলত জাহাঙ্গীর গেটে এসে ক্যান্টনমেন্ট এলাকার মধ্যে প্রবেশ করতে না পারায় মহাখালীতে গিয়ে সড়ক দুটি পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এরপর ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়ক নামে উত্তর দিকে চলে গেছে। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ প্রধান দুটি সড়ক একটি অন্যটির সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় মহাখালী পয়েন্টে এসে যান চলাচলের ঘনত্ব অনেক বেড়ে যায়। ঢাকা ইম্প্রুভমেন্ট ট্রাস্টের অধীনে ঢাকা মাস্টারপ্ল্যান ১৯৫৮-এর পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৫৮-৫৯–এর দিকে তৎকালীন ‘সিঅ্যান্ডবি’-এর মাধ্যমে মহাখালী জনস্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রবেশমুখ থেকে মহাখালী মোড় হয়ে বনানী রেলক্রসিং পর্যন্ত (পূর্ব পাশে) সড়কটি ৮০-৯০ ফুট প্রশস্ত করে সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হয়। এর লক্ষ্য ছিল ভবিষ্যতে এমনভাবে পরিকল্পনা নেওয়া, যাতে দুই সড়ক থেকে আসা যানবাহনের গতি অক্ষুণ্ন রেখে মহাখালী-বনানী করিডরকে গতিশীল রাখা যায়। সেখানকার গাছগুলো কংক্রিটে আচ্ছাদিত এই শহরের জন্য একধরনের ‘অক্সিজেন হাব’ ছিল। সেতু ভবন নির্মাণের সময় তেমন কোনো প্রতিবাদ হয়নি। পাশাপাশি সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ‘দেখেও না দেখার ভান’ ছিল। এ কারণে দায়িত্বে থাকা ‘রক্ষক’ কর্তৃপক্ষ পরবর্তীকালে ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), একাধিক নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় এবং বনানী অংশে বিদেশি সাহায্যপুষ্ট প্রকল্পের কার্যালয়সহ একের পর এক দখল কার্যক্রম চালাতে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের যান চলাচল নিরাপদ ও স্বাভাবিক রাখার দায়িত্বে থাকা যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থাগুলো দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই অধিকৃত জমিতে একের পর এক ভবন তৈরির অপচেষ্টা শুরু করে। এর ধারাবাহিকতায় নব্বইয়ের দশকে প্রথমে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অনুমোদন ছাড়াই সড়কের জন্য সংরক্ষিত ওই স্থানে যমুনা সেতু কর্তৃপক্ষের জন্য ভবন নির্মাণ করা হয়। পরে রাজউকের অনুমোদনহীন অবৈধ ওই ভবন ‘সেতু ভবন’ নামে স্থায়ীভাবে আসন গেড়ে বসে। এরই ধারাবাহিকতায় সেখানে জমি অধিগ্রহণের মূল চেতনাবিরোধী দখল কার্যক্রম চলমান থাকে। ৩. অধিগ্রহণে নেওয়া ওই জায়গা দখলমুক্ত রাখা ও দৃষ্টিনন্দন করার জন্য একসময় অসংখ্য গাছ লাগানো হয়েছিল। সেগুলো একে একে সবার চোখের সামনে বিলীন করা হয়েছে। সেখানকার গাছগুলো কংক্রিটে আচ্ছাদিত এই শহরের জন্য একধরনের ‘অক্সিজেন হাব’ ছিল। সেতু ভবন নির্মাণের সময় তেমন কোনো প্রতিবাদ হয়নি। পাশাপাশি সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ‘দেখেও না দেখার ভান’ ছিল। এ কারণে দায়িত্বে থাকা ‘রক্ষক’ কর্তৃপক্ষ পরবর্তীকালে ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), একাধিক নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় এবং বনানী অংশে বিদেশি সাহায্যপুষ্ট প্রকল্পের কার্যালয়সহ একের পর এক দখল কার্যক্রম চালাতে থাকে। বিভিন্ন সময় এ ধরনের অপরিণামদর্শী প্রকল্পের কারণে দুটি ‘মূল প্রবাহ’ করিডরের সমন্বয়ে সৃষ্ট গুরুত্বপূর্ণ এই মহাকরিডরের ‘শ্বাসরোধ’ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। সেই সঙ্গে ‘প্রবাহ করিডরে’ পার্শ্ব সড়ক ছাড়া যেকোনো ভবনের সরাসরি প্রবেশ নিয়ন্ত্রণবিষয়ক বিধিমালাটিও ভীষণভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে এ করিডরের যানজট দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে। যত দিন যাবে, তত বাড়বে। ৪. সড়কটির পশ্চিমে মহাখালী থেকে কাকলী পর্যন্ত রেললাইনের পাশে একচিলতে প্রশস্ততায় অনেকগুলো ভবন তৈরি হয়েছে। ফলে দৃষ্টিদূষণের পাশাপাশি এই গুরুত্বপূর্ণ করিডরটিতে অযাচিত চাপ সৃষ্টি করেছে। এগুলো অপসারণ এখন সময়ের দাবি। পশ্চিম পাশের এ ভবনগুলো সড়কের সম্প্রসারণে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার টুঁটি চেপে ধরেছে। পাশাপাশি এ ‘মহাকরিডর’জুড়ে গণপরিবহনভিত্তিক প্রকল্প হওয়ার যে সম্ভাবনা ছিল বা আছে, সেগুলোও হচ্ছে না। উল্লেখ্য, বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পটির জয়দেবপুর থেকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত প্রাথমিক পর্যায় ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। পরবর্তী পর্যায়ে এ করিডর ধরেই ঢাকার কেন্দ্রমুখী সম্প্রসারণ হওয়ার কথা। বলাই বাহুল্য, সড়ক সম্প্রসারণের জন্য অধিকৃত জমি দখলের কারণে সেটিও ব্যাহত হবে। এ ছাড়া ‘ইউলুপ’ প্রকল্পটিও এ অন্যায় দখলের ফলে যথাযথ নকশা ও আয়তনে করা যায়নি। ফলে অযাচিত যানজটের ‘যন্ত্রণা’ থেকে মুক্ত হওয়া যায়নি। ৫. সুনির্দিষ্টভাবে বললে, আইন অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট কারণে অধিগ্রহণকৃত জমি অন্য কোনো কারণে ব্যবহার করা যায় না এবং একই সঙ্গে ‘অননুমোদিত ভবন’ তা যে সংস্থারই হোক না কেন, তা কোনোভাবেই নির্মিত হতে পারে না। এরপরও রাজউকের অনুমোদন ছাড়াই এবং সরকার নির্দিষ্ট ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের সব ধরনের সিদ্ধান্তের বিপরীতে একের পর এক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো কর্তৃপক্ষ যেমন রাজউক, ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) কিংবা অন্য কোনো সংস্থা থেকে কোনো ধরনের আপত্তি তোলা হয়নি। বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পটির জয়দেবপুর থেকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত প্রাথমিক পর্যায় ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। পরবর্তী পর্যায়ে এ করিডর ধরেই ঢাকার কেন্দ্রমুখী সম্প্রসারণ হওয়ার কথা। বলাই বাহুল্য, সড়ক সম্প্রসারণের জন্য অধিকৃত জমি দখলের কারণে সেটিও ব্যাহত হবে। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ সড়ক সম্প্রসারণের জন্য অধিকৃত জমির এ অবৈধ দখল ও যান চলাচলের গতি বাড়ানোর সুযোগ নষ্ট করার এ প্রক্রিয়া অগ্রহণযোগ্য। প্রত্যাশা করি যাঁরা এ সব কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত, তাঁরা এ থেকে সরে আসবেন। পাশাপাশি যে ভবনগুলো ইতিমধ্যে অনুমতি ছাড়া তৈরি হয়েছে, সেগুলো অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়া হবে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যৎ ঢাকার উত্তর-দক্ষিণমুখী চলাচলের মূল যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন সম্ভাবনার যে অপমৃত্যু ঘটেছে, সেটি রোধ হবে। এটি একটি অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ ক্ষেত্রে অংশীজন হিসেবে যাঁদের দায়িত্ব রয়েছে, তাঁরা নিশ্চুপ থেকে অপরাধ করছেন। তাঁরা যাতে এর দায় নেন, সে জন্য সরকারের পক্ষ থেকে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। একজন পেশাজীবী হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর জায়গা দখলের সঙ্গে যুক্ত সরকারের সব সংস্থাকে দখলদারির অবসান ঘটানোর দাবি জানাচ্ছি। অবৈধ অবকাঠামোগুলো অপসারণ ও একই সঙ্গে মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী করিডরের প্রশস্তকরণের মধ্য দিয়ে যান চলাচল নির্বিঘ্ন করার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হোক।
Share On :
Archive by Year
2021
2019
2015
2014
2013
2012
2008
Archive by Media
- Rtv Talkshow
- DBC News
- Channel Nine
- Channel i
- Voice of Workers
- NEWS24
- Jago News
- ATN News
- ATN Bangla
- Desh Rupantor
- Ekattor TV
- Ekhon TV
- Jamuna TV
- Gtv
- SLIUD IUD
- Arch. BU
- The Daily Star
- Sunbd24
- Somoy TV
- Somoy TV Bulletin
- News Bangla 24
- Desh TV News
- Bengal Institute
- Nagorik TV
- Rahabar Multimedia
- Independent Television
- Tritiyo Matra
- ETV Talk Show
- mytv Bangladesh
- Deepto TV
- Keating Fan
- Priyo.com
- amadershomoy
- thereport.live
- songbadprokash
- dhakatimes24
- Daily Inqilab
- Daily Star Bangla
- Desh Rupantor
- Dhaka Post